ইউনেস্কো ১৯৮৩ সালে তাজমহলকে ‘বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। মমতাজ-শাজাহানের প্রেমের অমর কীর্তি এই তাজমহল। সারা বছর বিশ্বের অসংখ্য লোক আসে এর রূপ-সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতে। সৌন্দর্যের ষোলোকলা পূর্ণ হয় পূর্ণিমার চাঁদের আলোয়। নক্ষত্র আলোকিত রাতে চন্দ্রালোকে বা ঊষাকালে তাজের সৌন্দর্য মুগ্ধ করে দর্শককে।

ক্ষণে ক্ষণে রঙের বদল দেখা যায় ঊষাকালে। দুগ্ধধবল রুপালি রং নেয় ঊষায়, রুপালি থেকে গোলাপি লালে। সে রকমই সূর্যাস্তের সময় সোনা রং ধরে তাজ। অপূর্ব স্বর্গীয় রূপ নেয় তাজ। এখন তাই দিনের বেলার সাথে পূর্ণিমার দুই দিন আগে এবং দুই দিন পরে রাতের তাজ দর্শনের ব্যবস্থা করেছে উওরপ্রদেশ সরকার।

শাজাহান-মমতাজের ভালোবাসাকে অমর করতে সম্রাট শাজাহান তাজমহল বানানোর সিদ্ধান্ত নেন। এ ব্যাপারে সবার আগে আসে জায়গা নির্ধারণের ব্যাপার। শাজাহান তাজমহল বানানোর জন্য এমন স্থান খুঁজছিলেন, আগ্ৰা ফোর্ট থেকে যে জায়গা দেখা যায়। যে জায়গা তার পছন্দ হলো, সেটি ছিল রাজা মানসিংহের বংশের, তার পৌত্র রাজা জয়সিংহের দখলদারীতে।

শাজাহান জমিটি পছন্দ করেছেন শুনে জয়সিংহ সানন্দে জমিটি দান করতে চাইলেন। কিন্তু শাজাহান তার বদলে সমমূল্যের খাস জমি জয়সিংহকে লিখে দেন। শাজাহান এমন একটি মকবরা বানানোর ইচ্ছা মনে পোষণ করে চলছিলেন, যা ঐতিহাসিক মীর মুঘল বেগের মতে মৌলিক, নতুন, সার্থক, উৎকৃষ্ট এবং বিস্ময়কর ইমারত হবে। এ মনোবাসনা নিয়ে শাজাহান দেশ বিদেশের স্থাপত্যবিদদের থেকে নক্শা আহ্বান করলেন। বিভিন্ন দেশের স্থপতিরা তাদের নকশা শাজাহানের কাছে পেশ করেন। পারস্য থেকে আসা ওস্তাদ আহমেদ লাহাউরির নকশা পচ্ছন্দ হয় শাজাহানের।

এরপর ওস্তাদ ঈশার তত্ত্বাবধানে ৫৮০x৩০০ মিটার ব্যাপ্ত চত্বরে কাজ শুরু হয়। কাজ চলে দীর্ঘ ২২ বছর (১৬৩২-৫৪), ২০ হাজার কর্মী এর নির্মাণে নিযুক্ত থাকে। এছাড়া ১ হাজার হাতিকেও এ কাজে লাগানো হয়। খরচ পড়ে ৪০ লাখ পাউন্ড। কর্মীদের থাকার জন্য কলোনী তৈরি হয় মুমতাজবাদ, যেটি বর্তমানে তাজগঞ্জ নামে পরিচিত।

তাজমহল তৈরির জন্য বিশেষজ্ঞ আসে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে। এদের মধ্যে কেউ আসে বাগদাদ থেকে, কেউ তুরস্ক আবার কেউ ইতালি, কেউ ফ্রান্স থেকে। সহস্রাধিক হাতির পিঠে রাজস্থানের মকরানা থেকে শ্বেতমর্মর, ফতেহপুর সিক্রি থেকে লাল বেলে পাথর, পাঞ্জাব থেকে জাসপার, চীন থেকে জেড ও ক্রিস্টল আনা হয়। মণি, মুক্তা, পান্না, নীলা, প্রবাল, স্ফটিক এসেছে তিব্বত, রাশিয়া, আফগানিস্তান, পারস্য, শ্রীলঙ্কা, আরব ছাড়া ও বিভিন্ন দেশ থেকে।

ওস্তাদ ঈশার তত্ত্বাবধানে কাজ শুরু হলে তিনি বিভিন্ন বিভাগে কর্মী নিযুক্ত করে নেন। যারা নিজেদের দলনেতা হয়ে নিজ নিজ বিভাগে কর্মী নিযুক্ত করে কাজ এগিয়ে নিয়ে যান। তারা হলেন-
১. গম্বুজগুলোর ডিজাইন ইসমাইলের তত্ত্বাবধানে
২. লাহোরের কাজিম খানের তত্ত্বাবধানে ছিল স্বর্ণকাররা
৩. দিল্লির চিরঞ্জিলাল ছিলেন প্রধান ভাস্কর
৪. ইরানের আমানত খান ছিলেন প্রধান প্রবেশদ্বার এবং অভ্যন্তরের খোদাই শিল্পী।

প্রবেশদ্বার: তাজমহলে প্রবেশ করার পথে পড়ে তার ১৫১x১১৭ ফুট চওড়া এবং ১০০ ফুট উঁচু প্রবেশদ্বার। ১৬৪৮ সালে লাল বেলে পাথরের তৈরি তাজের প্রধান প্রবেশদ্বারে কোরআন থেকে আয়াত আরবিতে লেখা আছে। আটকোণা কক্ষরূপী প্রবেশদ্বারের শিরে ২২টি মিনার হয়েছে ছত্রিশরূপী ২২ বছরের দ্যোতক রূপে। এতে রুপার দরজা ছিল, যা মোগল শাসনের অবলুপ্তির পর জাঠেরা খুলে নেয়। পরবর্তীকালে রুপার দরজার রেপ্লিকারূপী দরজা হয়েছে পিতলের।

বাগান: প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢোকার পরে আসে তাজমহলের বাগান। ৩০০x৩০০ মিটার জায়গার বাগানের প্রতি চতুর্থাংশ উঁচু পথ ব্যবহার করে ভাগগুলোকে ১৬টি ফুলের বাগানে ভাগ করা হয়েছে। সাধারণত যে কোন সৌধকে মাঝখানে রেখে বাগান করা হয়, কিন্তু তাজমহলের ব্যাপারে তার কিছু বদল হয়েছে। তাজমহলে আগে বাগান এবং তারপর সৌধটি। এখানে সৌধের দরজার মাঝামাঝি বর্গক্ষেত্র আকারের একটি কৃত্রিম মর্মর জলধারা রয়েছে। যেটি এমনভাবে গঠন করা হয়েছে, যাতে তার উপর তাজমহলের প্রতিফলন দেখা যায়। সেই সাথে উওর ও দক্ষিণে ফোয়ারার সারি বেয়ে দেবদারু ও সাইকাসের লাইন।

মিনার: মিনারগুলো তাজমহলের মূল বেদির চারপাশে আছে। এগুলো তাজমহলের ওজনের ভারসাম্য বজায় রাখে। প্রতিদিন এগুলো থেকে আজান হয়। সৌধের মিনার তৈরির অনুপ্রেরণা পাওয়া যায় জাহাঙ্গীরের থেকে। তার আগে অবধি আকবরের সৌধে মিনারের উপস্থিতি নেই। চারটি মিনারই কিন্তু বাইরের দিকে কিছুটা হেলানো। এরমধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিমের মিনারটি শীর্ষদেশ কেন্দ্রবিন্দুর উপরে টানা আলম্ব লেখা থেকে ২০০ মিলিমিটার অর্থাৎ আট ইঞ্চি দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে হেলানো। আর বাকি তিনটি ৫০ মিলিমিটার মানে দুই ইঞ্চি হেলানো। মিনারগুলো নিচে মোটা থেকে উপরের দিকে সরু। প্রতিটি মিনারই দুটি করে বারান্দা দিয়ে তিনটি সমান উচ্চতায় ভাগ করা। মিনারের একেবারে উপরে সমাধির ছাতাগুলোর মতো একই রকমের ছাতা। মিনারের ছাতাগুলোতেও একই রকমের কাজ করা হয়েছে, যেমনটি করা হয়েছে পদ্মফুলের নকশা করা চূড়ায়।

গম্বুজ: দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার ব্যাপারে গম্বুজের একটি বিশাল ভূমিকা আছে। ঐতিহাসিকদের মতে, এর রূপকার উস্তাদ আহমেদ। লাহোর অধিবাসী এই বিখ্যাত স্থপতি শাজাহানের সময়ে উস্তাদ হামিদের সাথে মিলে যৌথভাবে লাল কিল্লাসহ বেশ কিছু ইমারতের প্ল্যান ও ছক কষে ছিলেন। তাজমহলের প্রধান গম্বুজটি তার ভিত্তির আকারের সমান। এটি ২১৩ ফুট উঁচু এবং ৬০ ফুট চওড়া। এর সাথে থাকা আর চারটি গম্বুজের উচ্চতা ১৬২.৫ ফুট। এত উঁচুতে হওয়ায় প্রধান গম্বুজটিকে এক হাত মিটার উঁচু সিলিন্ডার আকৃতির ড্রামের উপর রাখা হয়েছে। বড় গম্বুজটি দেখতে অনেকটা পেঁয়াজের মতো। গম্বুজের উপরের দিক সাজানো হয়েছে একটা পদ্মফুল দিয়ে। এই বড় গম্বুজের উপরে মুকুটের মতো একটা পুরোনো মেচাকার চূড়া রয়েছে। কথিত আছে, চূড়াটি ১৮০০ শতকের আগে অবধি স্বর্ণ নির্মিত ছিল। পরবর্তীকালে এটি ব্রঞ্জ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। চূড়ায় পারস্য দেশীয় এবং হিন্দু স্থাপত্যের সংমিশ্রণ ঘটেছে। চূড়ার উপরের অংশে আছে একটি চাঁদ। এর সাথে একটি লিংক যুক্ত আছে। উভয় মিলে হিন্দু দেবতা শিবের ত্রিশূলের মতো লাগে। বড় গম্বুজের চার কোণায় চারটি ছোট গম্বুজ আছে। ছোট গম্বুজে কাঁসা বা তামার দণ্ড আছে।