সুদীর্ঘকালব্যাপী চলা স্বাধীনতা সংগ্রামের বিজয়, বাঙালি জাতির মুক্তির সংগ্রামের বিজয়, ক্ষুদিরাম, তিতুমীর, সূর্যসেন, প্রীতিলতাসহ শতসহস মুক্তিপাগল বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের বিজয়, দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের বিজয়, বিশ্বের অন্যতম কথিত চৌকশ সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে সাধারণ বাঙালির যুদ্ধের বিজয়। বাঙালির জন্য স্বাধীন সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের বিজয়। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করার মাধ্যমে এ মাসেই পূর্ণতা লাভ করে বাঙালির স্বাধীনতা। ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতম হত্যাযজ্ঞ, অগ্নিসংযোগ, নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করে বাঙালি অর্জন করে একটি পতাকা, একটি ভূখণ্ড, একটি দেশ প্রিয় বাংলাদেশ। বিশ্বের বুকে আত্মপ্রকাশ ঘটে এক দুর্দম্য জাতি, একটি জাতিরাষ্ট্র বাংলাশে। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পথপরিক্রমায় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি জাতি তার নিজস্ব স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে।

গঙ্গা-পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র বিধৌত এই জনপদের মানুষের ভেতরে এক স্বাতন্ত্র বিদ্যমান। জীবনাচার, দৈনন্দিন চলাফেরা, আচার-আচরণ ও যাপিত জীবনের মধ্যে রয়েছে এক নিজস্বতা। খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, ভাষা ইত্যাদি সব দিক থেকেও উপমহাদেশের অন্য অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে রয়েছে পার্থক্য। এই পার্থক্যই আমাদের ভিন্ন জাতিসত্তার পরিচয় দিয়েছে। সামাজিক ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে বাঙালি জাতি। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়সহ অনেক সমাজ সংস্কারকের নিরন্তর ও নিরলস প্রচেষ্টায় এ জাতি পেয়েছে উন্নত পরিচয়।

বাঙালি জাতির রয়েছে এক সুদীর্ঘ ইতিহাস। যুগ যুগ ধরে বাঙালি শাসন-শোষণ আর নিপীড়নের শিকার হয়েছে, শাসিত ও শোষিত হয়েছে ভিন্ন জাতির দ্বারা। পরাধীনতা যুপকাষ্ঠে নিষ্পেষিত এই জাতিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য নিরন্তর গাইতে হয়েছে শেকল ভাঙার গান। শৃঙ্খল মুক্তির জন্য লড়াই করতে হয়েছে অবিরাম। সেই শেকল ভাঙার গানে আমাদের প্রেরণা ক্ষুদিরাম, তিতুমীর, সূর্যসেন, ইলামিত্রসহ অসংখ্য সংগ্রামী বাঙালি। নিরন্তর সেই সংগ্রামের পূর্ণতা পায় ১৯৭১ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৃঢ়চেতা সংগ্রামী ও দূরদর্শী বিচক্ষণ নেতৃত্বে। তিনিই বাঙালি জাতিকে দীর্ঘকালের পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেন, প্রতিষ্ঠা করেন বাঙালির জন্য স্বাধীন সার্বভৌম দেশ বাংলাদেশ। তাই তো তিনি আমাদের জাতির পিতা। বিজয়ের মাসের সূচনাদিনে গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। আরও স্মরণ করছি ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধের সব শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। স্মরণ করছি মুক্তিযুদ্ধের বীরঙ্গনাদের এবং সেসব বাঙালি ভাইবোনদের, যারা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিপদ জেনেও সহযোগিতা দিয়ে গেছে ৯ মাস। একই সঙ্গে স্মরণ করছি ইতিহাসের প্রবহধারায় যারা বাঙালির মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন, ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে জীবন দিয়েছেন।

১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যে বাঙালির জাতীয় জীবনে দুটো বড় রকমের ঘটনা ঘটেছে, যা বাঙালির ঐতিহ্যকে মহিমান্বিত করেছে। একটি ভাষা আন্দোলন অন্যটি ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। এ দুটিতে সংগঠিত শক্তি ছিল ছাত্রসমাজ আর সৈনিকের ভূমিকায় ছিল জনগণ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ার ছিল, বাঙালি জাতীয়তাবাদ। জয় বাংলা’ ছিল আমাদের অনুপ্রেরণা ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। আমাদের লক্ষ্য ছিল, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।

ব্রিটিশরা এদেশ ছাড়ার পরই বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম ভিন্নরূপ লাভ করে। জাতিসত্তার পরিচয়কে পেছনে ফেলে সাময়িক সময়ের জন্য সামনে চলে আসে ধর্মীয় পরিচয়। কিন্তু তা বেশিদিন স্থায়ী হতে পারেনি। বাঙালির ভাষার প্রশ্নেই ধর্মীয় বিষয়কে সমানে নিয়ে আসা নেতাদের শোষণের নকশা উম্মোচিত হয়ে যায় বাঙালির সামনে। ধর্মরাষ্ট্র পাকিস্তানের ২৪ বছরের শাসন আমলে শোষণ ও লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে বাঙালি জনগণের আন্দোলন সংগ্রাম ও সংঘর্ষ নিত্যদিনের কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছিল। ষড়যন্ত্র আর চক্রান্তই ছিল পাকিস্তানি শাসকদের বৈশিষ্ট্য। পূর্ব বাংলা ধ্বংসের নীল নকশা দিয়ে ১৯৪৭-এর মধ্য আগস্ট থেকে পাকিস্তানিরা বাংলাকে শাসন-শোষণ করা শুরু করে। প্রথম আঘাতই আসে বাঙালির ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ওপর। শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। রক্ত দিয়ে মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষা করা হয়। ভাষার আন্দোলন থেকে স্বাধিকারের আন্দোলন, স্বাধিকারের আন্দোলন থেকে পূর্ণতার পথে এগিয়ে যায় বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রাম। সামরিক শাসন, নিপীড়ন-নির্যাতন সবকিছু উপেক্ষা করে বাঙালি এগিয়ে যায় স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। অবশেষে সামনে আসে সাধারণ নির্বাচন। ১৯৭০ সালের সেই সাধারণ নির্বাচনে বাঙালি জাতির পূর্ণ সমর্থন নিয়ে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করে। নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে ক্ষমতায় লাভের পরিবর্তে বাঙালি পায় পাকিস্তানিদের ঘৃণ্য পরিকল্পনা ‘অপরেশন সার্চলাইট’। রাতের আঁধারে ঘুমন্ত মানুষের ওপর নেমে আসে বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নির্বিচারে গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন। এক সশস্ত্র যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয় নিরস্ত্র বাঙালি জাতির ওপর। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে জনযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এ দেশের মানুষ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ছাত্র, যুবক, পেশাজীবী, শ্রমজীবী ও গরিব কৃষকেরা প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেয়। এমনকি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঙালি সৈনিকদের এক বিরাট অংশ বিদ্রোহকে আলিঙ্গন করে বাঙালির স্বাধীনতার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটা প্রচণ্ড রকমের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র জনযুদ্ধ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছিল লক্ষ যোদ্ধা। আর তাদের ঘিরে ছিল আরও তিন লাখ মানুষ লড়াইয়ের ময়দানে যোদ্ধাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় অংশ নেয়। জনগণের এক বিরাট অংশ মুক্তিযুদ্ধ ও যোদ্ধাদের পক্ষে এগিয়ে আসে; ফলে তাদের হানাদার সৈন্য ও এদেশীয় দালাল ঘাতকদের রোষানলে পরে তাদের অনেকেই অধিকৃত বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে জীবন দিতে হয়েছিল। বাংলাদেশে জীবন আর ইজ্জত বাঁচাতে না পেরে প্রায় এক কোটি বাঙালিকে শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে হয়েছিল; দুই কোটি মানুষকে দেশের ভেতরে আত্মরক্ষা ও মানসম্মান বাঁচাতে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছিল। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ার ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ, জয় বাংলা ছিল আমাদের অনুপ্রেরণা ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক।

৯ মাসের এই সশস্ত্র যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ ও প্রায় তিন লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আসে আমাদের প্রিয় স্বাধীনতার বিজয়। একাত্তরের ডিসেম্বর মাসে মুক্তিযুদ্ধ সর্বাত্মক রূপ পায়। মুক্তিবাহিনীর অব্যাহত আক্রমণে কোণঠাসা হয়ে পড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। একের পর এক প্রবল আক্রমণের মুখে পিছু হটতে থাকে পাকিস্তানিরা। ১৯৭১ সালের এই দিনে নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গেরিলা সন্দেহে জিঞ্জিরায় অনেক যুবককে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয়েছে। বুড়িগঙ্গার অপর পাড়ের এই গ্রামটিতে অন্তত ৮৭ জনকে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। নারী-শিশুরা পর্যন্ত তাদের ওই নিষ্ঠুরতার হাত থেকে রক্ষা পায়নি।

১৯৭১ সালের ১ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী সিলেটের শমসেরনগরে আক্রমণ চালিয়ে টেংরাটিলা ও দুয়ারাবাজার শত্রুমুক্ত করে। একাত্তরের ডিসেম্বর মাস থেকেই মুক্তিপাগল বাঙালি বুঝতে পারে, তাদের বিজয় সুনিশ্চিত। তাই জোরদার হতে থাকে মুক্তিবাহিনীর গেরিলা আক্রমণ। একে একে মুক্ত হতে থাকে দেশের বিভিন্ন এলাকা। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল আক্রমণের মুখে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। এদিকে রাওয়ালপিন্ডিতে এক মুখপাত্র বিবৃতি দেন যে, শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার শেষ হয়নি। এদিন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পার্লামেন্ট বক্তৃতায় উপমহাদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানি সৈন্য অপসারণের জন্য ইয়াহিয়া খানের প্রতি আহ্বান জানান। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এমন পশ্চাৎপসারণের সময়েও রাজাকার, আলবদর ও স্বাধীনতাবিরোধীদের অপতৎপতা থেমে থাকেনি। জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতা যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযম বৈঠক করেন ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে। বৈঠকে তিনি পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়োগের দাবি তোলেন। গোলাম আযম কমিউনিস্টদের ‘অপতৎপরতা’ সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক থাকতে বলেন। এছাড়া মিত্রপক্ষ ভারতের হামলার প্রতিবাদে খুলনায় হরতাল পালন করেন শান্তি কমিটির সদস্যরা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সর্বাত্মক সহায়তা করে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গঠন করা রাজাকার বাহিনী। রাজাকার বাহিনীসহ আলবদর, আলসামস বাহিনীও বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে এদেশে গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন, ধর্ষণে লিপ্ত হয়। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধের পর ঢাকার রেসকোর্স ময়ানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের মাধ্যমে সূচিত হয় বাঙালির বিজয়।

বাঙালি জাতির সবচেয়ে আনন্দের মাস ডিসেম্বর। নিজস্ব জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাস। দিনটি মুক্তিযোদ্ধা দিবস হিসাবেও পালন করা হয়। তাই ডিসেম্বর এলেই মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রিয়জন হারানোর বেদনা বা ৯ মাসের নিদারুণ কষ্টকর জীবনযাপনের দুঃসহ যন্ত্রণার ভয়াবহ স্মৃতি নিয়েই আনন্দে উদ্বেলিত হয়। প্রতি বছরের মতো এবারও বিজয়ের মাসে দেশবাসী বিজয় আনন্দে উচ্ছ্বসিত হবে বাঙালি জাতি; শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও শোকে মুহ্যমান হয়ে মাথা নোয়াবে অগণিত শহীদ মুক্তিযোদ্ধার প্রতি। নানা আয়োজনে জাতি মুক্তিযুদ্ধের বিজয়গাথার স্মৃতিচারণ করা হবে আর বীর শহীদদের প্রতি জানাবে বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। জয় বাঙালি, বিজয় ডিসেম্বর। বিজয় বাঙালির। এ বিজয় চিরন্তর যত দিন বাঙালি থাকবে, যত দিন মানুষ থাকবে।