এমন একটা সময়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট অ্যান্থনিস কলেজ থেকে লিখছি, যখন পৃথিবীজুড়ে এক অদৃশ্য ভাইরাস হাজার হাজার জীবনকে নিয়ে যাচ্ছে মৃত্যুর মিছিলে। এই তো সেদিনও আমাদের দিন ছিল উচ্ছলতায় ভরা। আর এখন?

এপ্রিলের মাঝামাঝি। হিলারি টার্ম, মানে অক্সফোর্ডের দ্বিতীয় সেমিস্টার প্রায় শেষের দিকে তখন। ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অ্যান্ড ফাইন্যান্স ক্লাসে অধ্যাপক ব্যাখ্যা করছেন, এই মুহূর্তে একটি ভাইরাস বিশ্ববাজার অর্থনীতিতে কীভাবে কতটা প্রভাব ফেলছে। কিন্তু তখনো আমরা বুঝতে পারিনি, সেটাই ছিল ক্লাসরুমে পাশাপাশি বসে আমাদের শেষ ক্লাস।

হঠাৎ অক্সফোর্ডে বেশ কয়েকজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ায় নিমেষেই অক্সফোর্ডের চেনা দৃশ্যপট পাল্টে গেল। সপ্তাখানেক পরই বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস আর সুইজারল্যান্ডে আমাদের বিভাগের শিক্ষাসফর বাতিল হলো। শুধু শিক্ষাসফরই নয়; বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস, সেমিনার, ডিপার্টমেন্টসহ এক শতাধিক লাইব্রেরি সব বন্ধ করে দেওয়া হলো। ব্রিটেনের স্নাতক শিক্ষার্থীদের কলেজ ছেড়ে বাসায় চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো। আমার মতো বিদেশি স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের জন্য থাকার বা দেশে ফিরে যাওয়ার দুটো পথই খোলা রাখা হলো। পরীক্ষাসহ শিক্ষাবর্ষের সব কার্যক্রম অনলাইনভিত্তিক করে দেওয়া হলো। অধিকাংশ শিক্ষার্থী তাড়াহুড়ো করে ক্যাম্পাস ছাড়ল।

এর কিছুদিন পর করোনার ভয়াবহ সংক্রমণ ঠেকাতে ব্রিটিশ সরকার ঘোষণা করল ২১ দিনের লকডাউন। সঙ্গে সঙ্গে অক্সফোর্ডের কলেজগুলোর ডাইনিং, লাইব্রেরি, লেকচার থিয়েটার, স্টাডিজ সেন্টার, জিম, কমনরুম এমনকি রুম ক্লিনিং সার্ভিস পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হলো। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিক হলগুলোকেই কলেজ বলা হয়। যেহেতু লকডডাউনের দিনগুলোতে রান্না করেই খেতে হবে, বাজার করতে সুপারশপগুলোয় গিয়ে দেখলাম, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের তাকগুলো ফাঁকা।

বিচিত্র অভিজ্ঞতা আর জ্ঞানার্জনের শ্রেষ্ঠ প্ল্যাটফর্ম বলে অনেকের মতো আমারও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা সময় ছিল কলেজজীবন। আমাদের কলেজে আমরা ছিলাম ৭৭ দেশ থেকে আসা ৪০০–এর মতো শিক্ষার্থী। আমাদের গল্প জমে উঠত একাডেমিক পড়াশোনার বাইরেও নিজ নিজ দেশের শিল্প-সংস্কৃতি, ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি, ব্যক্তিগত ভালো লাগা মন্দ লাগাসহ আরও কত কী! কিন্তু মাঝপথে হঠাৎ করোনা এসে সবাইকে আলাদা করে দিল।

লকডাউনের আগে দিনে চৌদ্দ-পনেরো ঘণ্টা ক্লাস, লাইব্রেরিতে কাটাতাম। ব্রিটিশ আবহাওয়ার কনকনে শীত-বৃষ্টির বৈরিতা উপেক্ষা করে নিয়মিত অক্সফোর্ড ইউনিয়নের টক, ডিবেট কিংবা সেলডোনিয়ান থিয়েটারের অর্কেস্ট্রা, বেথোভেন উপভোগ করতে যেতাম। এখন এখানে রৌদ্রোজ্জ্বল দিন। ড্যাফোডিল, চেরি, জেসমিন, গ্লোরি ফ্লাওয়ারসহ নানা ফুলে অপূর্ব হয়ে আছে অক্সফোর্ডের ক্যাম্পাস। কিন্তু নেই শিক্ষার্থীদের পদচারণা। অক্সফোর্ডের গির্জাগুলোয় আর ঘণ্টা বাজে না। সব ব্যস্ততা, সব গতি স্তব্ধ হয়ে গেছে। তিন সপ্তাহ হতে চলল কলেজের বাইরে যাই না। পড়াশোনায়ও তেমন মনোযোগ আসে না। সিনেমা দেখে, গান শুনে, পত্রিকা পড়ে, রান্না করে আর ফেসবুকের টাইমলাইন স্ক্রল করে রুমের মধ্যেই কাটে দিন।

বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ বেড়ে চলেছে, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। এই সংবাদগুলোয় ভীষণ দুশ্চিন্তা হয়। ফোনের ওপাশে মা–বাবা আর আপনজনদের  উদ্বেগভরা কণ্ঠস্বরে মন খারাপ হয়ে যায়। তাদের বোঝাই, এই মুহূর্তে বাংলাদেশ আর যুক্তরাজ্যের মধ্যে আকাশপথে যোগাযোগ বন্ধ আছে, তাই আসা সম্ভব নয়। সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রতিমুহূর্তে প্রার্থনা করি, মানবের এই করুণ মৃত্যু দ্রুত বন্ধ হোক। কোনো ঝড়ই চিরস্থায়ী নয়। করোনার এই দুর্বিষহ দিনগুলোও একদিন শেষ হবেই। সেই সুন্দর সময়ের অপেক্ষায়।