হিজরি বছরের নবম মাস রমজান। এ মাস বছরে একবারই আসে। এ মাসকে আলোকিত করতে রহমত বরকত মাগফেরাত ও নাজাত লাভে শাবান মাস

বিশ্বনবির প্রতি অগাধ প্রেম ও ভালোবাসা প্রদর্শনের মাস শাবান। সুন্নাতের অনুসরণে এ মাসে ইবাদতের মশাল জ্বালালে মুমিন মুসলমান পাবে বিশ্বনবির ভালোবাসা আর জান্নাতে হতে পারবে তার সঙ্গী। হাদিসে তেমনি নির্দেশনা এসেছে-

হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বলেছেন, ‘হে ছেলে! যদি পারো এভাবে সকাল ও সন্ধ্যা অতিবাহিত করো, যেন তোমার অন্তরে কারও প্রতি প্রতিহিংসা বা বিদ্বেষ না থাকে। তবে তাই করো।’

অতপর বললেন, ‘এটাই আমার সুন্নত বা আদর্শ। যে ব্যক্তি আমার সুন্নত অনুসরণ করল, সে প্রকৃতপক্ষে আমাকে ভালোবাসল; যে আমাকে ভালোবাসল, সে জান্নাতে আমার সঙ্গেই থাকবে।’ (মিশকাত, তিরমিজি)

রমজানের আলোর মশাল জ্বালাতে শাবন মাস জুড়ে বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ ও অনুকরণ করতে নফল ইবাদত-বন্দেগি ও রোজায় অতিবাহিত করা জরুরি। যেমনটি নির্দেশনা দিয়েছেন বিশ্বনবি।

শাবান মাসজুড়ে মুমিন মুসলমানের ইবাদত-বন্দেগি দেখে যেন কেউ বুঝতে না পারে এটি কি রমজান না শাবান মাস। যেমনিভাবে বিশ্বনবি শাবান মাসে রোজা রাখা শুরু করলে মনে হতো যে তিনি আর রোজা ভাঙবেন না।

আবার নামাজ পড়া দেখলে মনে হতো যে তিনি মনে হয় আর নামাজ ছাড়বেন না। লাগাতার নামাজেই জীবন কাটিয়ে দেবেন। হাদিসে এসেছে-
– হজরত উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শাবান ও রমজান মাস ছাড়া অন্য কোনো দুই মাস একাধারে রোজা রাখতে দেখিনি। (আবু দাউদ)
– হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শাবান মাসের মতো এত অধিক (নফল) রোজা অন্য কোনো মাসে রাখতে দেখিনি। এ মাসের অল্প কয়েক দিন ছাড়া বলতে গেলে সারা মাসই তিনি রোজা রাখতেন।’ (তিরমিজি)
– হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হল, রমজানের পরে কোন্ মাসের রোজা সবচেয়ে বেশি ফজিলতপূর্ণ? উত্তরে তিনি বলেন, রমজানের সম্মানার্থে শাবানের রোজা।’ (তিরমিজি|)

মহান আল্লাহ তাআলা এ মাসেই বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মনকে বিশাল দুই নেয়ামত দানের মাধ্যমে আলোকিত করে দিয়েছেন। বিশ্বনবি এ আনন্দে রমজানের আগেই জালিয়ে তুলেছিলেন রমজানের আলো।

মুসলিম উম্মাহও বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতের অনুসরণে এ মাসজুড়ে রমজানের আলো জ্বালাতে নফল ইবাদত, নামাজ, এবং রোজা রাখবে।

মুমিন মুসলমান যদি রমজানের চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণকল্পে নফল ইবাদত, রোজা ও কুরআন তেলাওয়াতে একনিষ্ঠ হতে পারে তবে কাবার মালিক এ বিশ্বকে মহামারি করোনাসহ যাবতীয় রোগ-ব্যধি হতে মুক্ত করতে পারেন।

এ কারণেই বিশ্বনবি শাবান মাসজুড়ে পড়তেন-
اَللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِىْ شَعْبَانَ وَ بَلِّغْنَا رَمَضَانَ
উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি শাবানা ওয়া বাল্লিগনা রামাদান।’
অর্থ : হে আল্লাহ! শাবান মাসের বরকত দান করুন আর আমাদের রমজানে পৌছে দিন।’

বিশ্বনিব বর্ণিত হাদিস ও দোয়ার মাধ্যমে নতুন চেতনায় উজ্জীবিত ও আলোড়িত হওয়ার মাস শাবান। এ মাসে বিশ্বনবির অনুসরণ ও অনুকরণে ইবাদত করতে পারলেই তার প্রতি বেশি বেশি দরূদ পড়তে পারলেই সম্ভব তার সঙ্গে জান্নাতে বসবাস।

সুতরাং এ মাসের অবশিষ্ট দিনগুলোতে রমজানের আলো জ্বালাতে আল্লাহর সে নির্দেশ অনুসরণ করে বিশ্বনরি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি দরূদ পড়া দরকার। আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে নির্দেশ দিয়ে বলেন-
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা নবির প্রতি পরিপূর্ণ রহমত বর্ষণ করেন, ফেরেশতাগণ নবির জন্য রহমত কামনা করেন। (সুতরাং) হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ করো এবং যথাযথভাবে সালাম পেশ করো।’ (সুরা আহজাব, আয়াত ৫৬)

মহান আল্লাহর এ গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাও নাজিল করেছেন বরকতময় শাবান মাসে। সুতরাং রমজান মাসকে আলোকিত করতে শাবান মাসের অবশিষ্ট দিনগুলোতে বেশি বেশি দরূদ পড়া মুমিনের ঈমানের একান্ত দাবি।
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ، وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ، وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ، وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ، وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيد
উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা ছাল্লি আলা মুহাম্মাদিউঁ ওয়া আলা-আ-লি মুহাম্মাদিন কামা ছাল্লাইতা আলা ইবরা-হিমা ওয়া আলা আ-লি ইবরাহিমা ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ। আল্লা-হুম্মা বা-রিক আলা মুহাম্মাদিউঁ ওয়া আলা-আ-লি মুহাম্মাদিন কামা বা-রাকতা আলা ইবরা-হিমা ওয়া আলা আ-লি ইবরাহিমা ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ। (বুখারি, মুসলিম ও মিশকাত)

অর্থ : ‘হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর পরিবারবর্গের উপর শান্তি বর্ষণ কর, যেভাবে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও তাঁর পরিবারবর্গের উপর শান্তি বর্ষণ করেছিলে। নিশ্চয়ই তুমি অতি প্রশংসিত মহিমান্বিত।
‘হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর পরিবারবর্গের উপর বরকত দান কর, যেভাবে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও তাঁর পরিবারবর্গের উপর বরকত দান করেছিলে। নিশ্চয়ই তুমি অতি প্রশংসিত মহিমান্বিত।

মনে রাখতে হবে
রমজানকে আলোকিত করতে এ মাসে বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মতো ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকা জরুরি। কেননা রমজানের প্রস্তুতিতে তিনি সবচেয়ে বেশি ইবাদত-বন্দেগি করতেন।

শুধু ইবাদত-বন্দেগিই নয়, এ মাস আসলেই বিশ্বনবি খুব সাবধানতা অবলম্বন করতেন। রমজানের দিনক্ষণ গণনা করতে থাকতেন। কখন রমজান আগমন করবে, সেই প্রতিক্ষায় থাকতেন। হাদিসে এসেছে-
হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাবান মাসের (দিন-তারিখের হিসাবের) প্রতি এত অধিক লক্ষ্য রাখতেন, যা অন্য মাসে রাখতেন না ‘ (আবু দাউদ)

সুতরাং মুমিন মুসলমানের জরুরি যে, শাবান মাসেই রমজানকে আলোকিত করতে নূন্যতম সেসব কাজ করা যা বিশ্বনবি করতেন-
হজরত উসামা বিন যায়দ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! আপনাকে শাবান মাসে যে পরিমাণ রোজা পালন করতে দেখি অন্য মাসে তা দেখি না ; এর কারণ কী?

তিনি বললেন: রজব এবং রমজানের মধ্যবর্তী এ মাসটি সম্পর্কে মানুষ উদাসিন থাকে । অথচ এ মাস এত গুরুত্বপূর্ণ যে , এ মাসে আল্লাহ তাআলার কাছে মানুষের আমলগুলো উপস্থাপন করা হয়। আমি চাই রোজা অবস্থায় আমার আমলগুলো উপস্থাপন করা হোক।’ (মুসনাদ আহমাদ)

সে কারণে শাবান মাসের গুরুত্ব অনুধাবন করে আল্লাহর রাসুলের সাহাবিরাও অধিক পরিমাণে নেক আমল করতেন, রোজা রাখতেন।

হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রাণপ্রিয় সাহাবিরা শাবান মাসের চাঁদ দেখে-
– পবিত্র কুরআনুল কারিম বেশি বেশি তেলাওয়াত করতেন।
– সম্পদের জাকাতের মাল আলাদা করে ফেলতেন। যাতে গরিব ও মিসকিনরা উপকৃত হতে পারে।
– ব্যবসায়ীরা এ মাসে তাদের ঋণ পরিশোধ করে ফেলতেন।
– অধিকার প্রাপ্যদের তাদের প্রাপ্য আদায় করে দিতেন।’ (গুনিয়াতুত তালেবিন)

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে শাবানের অবশিষ্ট দিনগুলোতে ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে রমজানকে আলোকিত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।